সুন্দরবনের অভিশাপ
সুন্দরবনের গভীরে নিষিদ্ধ অঞ্চলে প্রবেশ করে একদল জেলে, লোভের বশবর্তী হয়ে। অতিপ্রাকৃত শক্তির মুখোমুখি হয়ে তাদের কি ভয়ঙ্কর পরিণতি হবে?
প্রথম অধ্যায়: অশুভ সূচনা
সূর্য রক্তের মতো লাল রঙ ধারণ করে পশ্চিম দিগন্তের দিকে নেমে যাচ্ছে। সুন্দরবনের ঘন জঙ্গলে দ্রুত নেমে আসছে অন্ধকারের চাদর, নিঃশব্দতা ভেদ করে শুধু নদীর জলের ছলছল শব্দ।
রহিমের নৌকায় বসে, জব্বার আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল,
“আর কতো দূর রহিম ভাই? আল্লাহ না করুক আজ রাতে ঝড় আসে যে...”
রহিমের মুখে ছিল লোভচকচকে হাসি,
“ভয় পাস কেন? আধাঘণ্টা লেগেছে, বোরগুনার সেই নিষিদ্ধ খালটা কাছেই। ”
দ্বিতীয় অধ্যায়: ভুল পথে
মাছের শোল দেখে রহিমের লোভ আরো বেড়ে গেল। জব্বার আর সাথের তরুণ জেলেটা বলল,
“মাছ আছে বইলা সন্দেহ নাই, কিন্তু খালটার ভেতর কিছুক্ষণ আগে থেকে একটা মরা মরা গন্ধ পাচ্ছি। ফিরে যাই না?”
অভিজ্ঞ জেলের সতর্কতা উড়িয়ে দিল রহিম,
“খবরদার! আরেকটু এগোলেই ধরা পড়বে ইলিশের মেলা।”
গভীর অন্ধকারে এগিয়ে যেতেই হঠাৎ থমকে দাঁড়ালো নৌকা। কতো জোরেই না চালান বৈঠা, নৌকা এক ইঞ্চি সরছে না। মরা গন্ধ এখন বাতাসে তীব্র হয়ে উঠেছে।
তৃতীয় অধ্যায়: অতিপ্রাকৃত ভয়
চারপাশে অজানা আওয়াজের ক্যাকোফোনি। কাঁটাযুক্ত গাছের পাতায় বিরক্তিকর শিস, বাতাসে ছেড়ে যাওয়া দীর্ঘশ্বাস, আর ঝোপঝাড় থেকে বেরিয়ে আসা গভীর, গর্জনের মতো অদ্ভুত শব্দ। কাপাকাপি শুরু হয়ে গেছে জব্বারের শরীরে।
“ভূ...ভূ...ভূত...”
কিন্তু রহিমের বোধশক্তি লোপ পেয়েছে। লোভ তার মাথা খেয়ে ফেলেছে।
চতুর্থ অধ্যায়: রহস্যময় আলো
ঝোপের মধ্যে হঠাৎ জ্বলে উঠলো ঠান্ডা, নীলচে আলো। কেউ যেন মশাল জ্বালিয়েছে। গা ছমছম করে উঠল সবার। কিন্তু রহিম এবারও এগিয়ে গেল।
“যে যাই থাকুক, খালি হাতে ফিরবো না কিন্তু।”
আলোটার উৎসটা খুঁজে পেয়ে থমকে গেল তারা। এক বিশাল বটগাছ। তার নিচে বসে এক বৃদ্ধা, সাদা শাড়ি জড়িয়ে, সারা শরীরে গাছের ছালের মতো বলিরেখা।
পঞ্চম অধ্যায়: বৃদ্ধার অভিশাপ
বৃদ্ধা হাত তুলে থামাল তাদের, গম্ভীর কন্ঠে বললো,
“জানো না, এই মাটি আমার বাপ-দাদারা রক্ত দিয়া পূণ্য করেছিল? সুন্দরবন দেবতার মন্দির, তোরা এসেছিস লুট করতে?”
অহংকারে ঠোঁট বাঁকালো রহিম,
“থামাও বুড়ি তোমার বকবকানি! মাছ নেবো আমরা, পারলে আটকাও!”
বৃদ্ধার চোখে ঝলসে উঠলো অশুভ রাগ,
“লোভী জেলে! তোদের দিব অভিশাপ! এই জঙ্গলই তোদের কবর হবে!”
ষষ্ঠ অধ্যায়: ভয়াবহ পরিণাম
বৃদ্ধার কথা শেষ হতে না হতেই এক অলৌকিক ঝড় শুরু হল। মনে হল যেন গাছগুলো চিৎকার করে উঠলো। একটি বিশাল ঢেউ উঠে নৌকাটিকে ছিন্নভিন্ন করে ফেলল।
জব্বার আকস্মিক জ্বরে কাতরাতে শুরু করল। আবার হঠাত তার শরীর হয়ে গেল ঠান্ডা। আধঘন্টার মধ্যে সব শেষ। জব্বারের নিথর দেহ নদীর জলে ভেসে গেল।
রহিমের মধ্যেও দেখা দিল কাঁপুনি, কিন্তু সেটা ভয় থেকে নয়, এক দুর্দমনীয় জ্বর। তার মনে পড়তে লাগলো বুড়ির কালো চোখ দুটো, আর অশুভ অভিশাপ!
সপ্তম অধ্যায়: মুক্তির পথ
সারারাত কাটলো কষ্টের মধ্যে। সকালে, বাতাসে তখন মিশে আছে মৃত্যুর গন্ধ। পাথরের মতো বুক নিয়ে রহিম ভাসিয়ে দিল বন্ধুর দেহ।
“জব্বার ভাই, আমারে ক্ষমা করো। আমি লোভের কাছে হেরে গেছি!”
তারপরেই দেখল, সামনেই ঝোপের আড়াল থেকে উঠে আসছে বুড়ি।
“বুড়ি, আমাকে বাঁচাও! তোমার যা খুশি শাস্তি দাও।”
বুড়ি দীর্ঘশ্বাস ফেলল,
“শুধু ক্ষমা চাইলে হবে? প্রকৃতিকে এত অসম্মান?”
রহিম মাথা কুটতে লাগলো,
“না, না...যা বলবে সব করবো...”।
বুড়ির ঠোঁটে এক বিকট হাসি,
“দরকার নেই তোর প্রায়শ্চিত্ত। বনের রক্ষাকর্তা দেখবে কী করতে হয়...”
অষ্টম অধ্যায়: রক্ষাকর্তার মুখোমুখি
ভাসতে ভাসতে রহিম চোখে দেখল এক দৃশ্য যা রক্ত হিম করে দিল। এক বিশাল, কুৎসিত প্রাণীর মত সুন্দরবনের মাটিতে হামাগুড়ি দিয়ে চলেছে, আর তার পিছনে ফেলে আসছে মরা, পচা মাছের ঢিবি।
প্রাণীটা যত এগিয়েছে মাটি তত কালো হয়ে রোগাক্রান্তের মত ছোপ ছোপ হয়ে গেছে। রহিম আর্তনাদ করে উঠলো। হঠাৎ, প্রাণীটা ঘুরে তার দিকে তাকালো।
গাছের শেকড়ের মত হাত-পা, পিঠে অসংখ্য কাঁটা আর চোখ দুটো আগুনের মতো লাল।
নবম অধ্যায়: পরীক্ষা
“মানুষ। তুমি বনের পবিত্রতা নষ্ট করেছ। তোমার শাস্তি মৃত্যু। ” কণ্ঠটা গর্জন করে উঠল,
রহিম ভয়ে অজ্ঞান হতে বসেছিল।
“না, ওর মৃত্যু হবে, কিন্তু তার আগে শুদ্ধ হতে হবে। “ প্রতিধ্বনিত হল বুড়ির কণ্ঠ।
রক্ষাকর্তার মাথা ঘুরে গেল।
“মানুষটির লোভ সীমাহীন। ভয় সে পাবে যদি নিজের লোভের দ্বারা ধ্বংসপ্রাপ্ত প্রকৃতি দেখে। তবেই বুঝবে ভুল...”
রহিম ক্ষীণ গলায় বলল, “যা বলবে করবো। ওইসব মাছ নিয়ে আমার কিছু যায় আসে না...শুধু প্রাণটা...”
রক্ষাকর্তা তাকালো বুড়ির দিকে। বুড়ি মাথা ঝাঁকালো।
“কথা কম, কর্ম বেশি। তোমাকে এমন এক অরণ্য দেখাতে হবে যেখানে লোভের জন্য সব ধ্বংস হয়...”
দশম অধ্যায়: শিক্ষা
রহিম যখন চোখ খুলল, দেখল নিজেকে এক অচেনা জায়গায়। চিরচেনা গাছপালা, কিন্তু একটা মড়ার গন্ধ বাতাসে। এগিয়ে যেতেই রব নেমে এলো। গাছগুলো পচে যাওয়া কাঠ। নদীর জল কালো হয়ে আছে।
মাছগুলো ভেসে উঠেছে, সাদা পেট দেখিয়ে। এখানে বনের সবকিছু মরে গেছে।
“এই হলো তোমার লোভের রাজ্য...” বুড়ির কণ্ঠ শুনে ঘুরে গেল রহিম।
কিন্তু বুড়িকে দেখল না। শুধু একটা বিশাল বটগাছের নিচে একটা ফল ধরে আছে। লাল, রসালো ফল। রহিমের পেটে ক্ষুধার কামড় বসলো...কিছুটা খেলেই হয়তো সে সুস্থ হয়ে উঠবে…
সমাপ্তি
রহিম কি ফলটির দিকে এগোল? সুন্দরবন থেকে কি সে বেঁচে ফিরতে পারল? বনের রক্ষাকর্তা কি তার লোভ পরীক্ষা করতেই এই আয়োজন করেছিল? সেই বুড়িই কি মূলত সুন্দরী, প্রকৃতির প্রতীক? প্রশ্ন থেকেই যায়। পাঠক যেন নিজেরাই গল্পের পরের অংশ লিখে ফেলে, এবং ভাবে প্রকৃতিকে নষ্ট করার মূল্য কী, আর কিভাবে আমরা সুন্দরবনের মত পবিত্র ভূমিকে বাঁচিয়ে রাখতে পারি।